কাঠিয়া বাবা শ্রীশ্রী ১০৮ স্বামী কৃষ্ণদাসজী মহারাজ

কাঠিয়া বাবা শ্রীশ্রী ১০৮ স্বামী কৃষ্ণদাসজী মহারাজ

এই সম্প্রদায়ের ৫৭তম আচার্য আমার পরমারাধ্য, পরমপূজ্য গুরুদেব, কাঠিয়া বাবা শ্রীশ্রী ১০৮ স্বামী কৃষ্ণদাসজী মহারাজ। সদ্গুরুকৃপায় কি ভাবে এক জীবন পূর্ন ভাবে ধন্য হতে পারে ও গুরুদেবের কৃপায় যে জীবিত থাকতেই ভগবদ্দর্শন পাওয়া যায়, আমার শ্রীশ্রীগুরুদেবের পূত জীবন তার প্রত্যক্ষ প্রমাণ। সদগুরুর কৃপা যে দেশ ও কালের ব্যবধানের দ্বারা সীমিত নয় ও গুরুদেবের আদেশ নির্বিচারে পালন করে কি ভাবে গুরুভক্তি লাভ করে এই ঘোর কলিকালেও ব্রহ্মজ্ঞান লাভ করা যায়, তার প্রমাণ আমার শ্রীশ্রীগুরুদেবের জীবনে সুস্পষ্ট ভাবে পাওয়া যায়। এখানে তাঁর পূত জীবনের কিছু দিগ্ দর্শন দেওয়া হচ্ছে। তাঁর লীলা সম্পূর্ণরূপে বর্ণনা করা অসম্ভব এবং সেটা এই লেখার উদ্দেশ্যও নয়। তবে তাঁর আদর্শ পালন করে যে কোনও মনুষ্য অনন্যা গুরুভক্তির দ্বারা গুরুদেবের কৃপায় পরম মঙ্গল স্বরূপ মোক্ষপদ দেহে থাকতেই পেতে পারে সেই আদর্শকে কিছুটা প্রকাশ করাই এই সংক্ষিপ্ত বিবরণের লক্ষ্য।

বর্তমান ঝাড়খন্ডের সাহেবগঞ্জ জেলার রাজমহল গ্রামে তাঁর জন্ম হয়। পতিতপাবনী গঙ্গা নদীর তীরে স্থিত এই গ্রামে, ১৪ই অক্টোবর ১৯৩৯ ইং সালে আশ্বিন মাসের শুক্লা দ্বিতীয়া তিথিতে মাতৃ গর্ভ থেকে ভূমিষ্ঠ হন। তাঁর পিতা শ্রী রমানাথ সিংহ ছিলেন পেশায় উকিল আর তিনি রাজমহল সাব ডিভিসনাল কোর্টে প্র্যাক্টিস করতেন। তাঁর মা ছিলেন হৃদয়বাসিনী দেবী। শ্রীশ্রী বাবাজী মহারাজের মাতা-পিতা তাঁর নামকরণ করলেন, কৃষ্ণানন্দ সিংহ। তিনি সাত ভাই বোনেদের মধ্যে সর্ব কনিষ্ঠ ছিলেন। এই কারণে তিনি সকলের আদরের পাত্র ছিলেন এবং সকলের নিকট তিনি প্রচুর পরিমানে ভালবাসা পেতেন।

শ্রীশ্রী বাবাজী মহারাজের মাতা-পিতা শ্রীশ্রী সন্তদাসজী মহারাজের নিকট দীক্ষা গ্রহণ করেছিলেন। দুই জনই পরম ভক্ত বৈষ্ণব ছিলেন এবং তাঁর সকল সন্তানই এই সম্প্রদায়ে দীক্ষা প্রাপ্ত হয়েছিলেন। তাঁদের গ্রামের বাড়ির একটি ঘর পূজার ঘর ছিল যেখানে শ্রীশ্রী ঠাকুরজীর, শ্রীশ্রী সন্তদাসজীর এবং শ্রী শ্রী রামদাস কাঠিয়া বাবাজী মহারাজের নিত্য সেবা-পূজা ও আরতি ইত্যাদি হত। বাড়ির সকলেই শ্রীশ্রী সন্তদাসজীকে “মহারাজজী” বলে ডাকতেন। খুব অল্প বয়স থেকেই শ্রীশ্রী বাবাজী মহারাজ “মহারাজজী”কে খুব শ্রদ্ধা-ভক্তি করতেন। যখন তাঁর বয়স ৬ কি ৭, তখন তিনি প্রথম বার শ্রীশ্রী রামদাস কাঠিয়া বাবাজী মহারাজের এবং শ্রীশ্রী সন্তদাসজী মহারাজের জীবনী পড়েছিলেন। যখন তাঁর বয়স ১৩ বছর, তখন তিনি এই দুই মহাপুরুষের জীবনী আবার পড়লেন আর এই বার শ্রীশ্রীসন্তদাসজী মহারাজের জীবন চরিত তাঁর মনের ওপর একটি গভীর ছাপ পড়ল। উনার মনে হতে লাগল যে “মহারাজজী”র আদর্শগুলি অনুসরণ করলে মনুষ্য জীবনের সমস্ত কিছু প্রাপ্ত হওয়া যায়। জাগতিক ও আধ্যাত্মিক বিষয়ে যা কিছু পাবার, সেই সব কিছু “মহারাজজী”র জীবনের আদর্শ অনুসরণ করলে পাওয়া যাবে, এইরূপ দৃঢ় ধারণা তাঁর মনে গেঁথে গেল। শ্রীশ্রী বাবাজী মহারাজের মনে ইচ্ছা হল যেন তাঁর জীবনেও তিনি সেই আদর্শকে অনুসরণ করতে পারেন। উনি“মহারাজজী”র ছবি সম্মুখে দাঁড়িয়ে এই ভাবে প্রার্থনা করতেন, “মহারাজজী, আপনি কৃপা করে আমাকেও সেই পথে নিয়ে যান যে পথে আপনি নিজে চলেছিলেন। আপনি কৃপা করুন যাতে আমি আপনার দেখান পথটি অনুসরণ করতে পারি।” তাঁর ভবিষ্যৎ জীবন দেখে আমরা বুঝতে পারি যে তাঁর এই প্রার্থনা “মহারাজজী” পূর্ণ করেছিলেন কারণ তাঁর ও “মহারাজজী”র জীবনে বিস্ময়কর সাদৃশ্য আছে যেটা আকস্মিক বলা অসম্ভব। এই কথার পুষ্টি তাঁর গুরুদেব শ্রীশ্রী প্রেমদাসজী মহারাজও করেছিলেন।

মনুষ্য জীবনের উদ্দেশ্য ও সার্থকতা ভগবদ্দর্শন লাভ ভিন্ন কিছু নয়, এই ধারণা অনেক অল্প বয়স থেকেই শ্রীশ্রী বাবাজী মহারাজের মনে দৃঢ়ীভূত হয়েছিল। তিনি কোথাও পড়েছিলেন যে “ভগবানকে পেতে হলে বনে জঙ্গলে তপস্যা করতে হয়”, এই চিন্তা করে তিনি বাড়ির বাগানে গিয়ে ভগবৎ ধ্যান করার চেষ্টা করতেন। একবার কোথাও শুনলেন যে সূর্যোদয়ের সময় পূর্বাভিমুখে বসে ভগবানের ধ্যান করলে ভগবান শ্রীঘ্রই দর্শন দেবেন। সেটা শুনে তাই করতে উদ্যত হলেন। এইগুলো শিশু সুলভ আচরণ হলেও তিনি নিজের এই চেষ্টাগুলির প্রতি খুব নিষ্ঠাবান ছিলেন।

ভগবদ্দর্শনের প্রথম সোপান হচ্ছে সদ্গুরু আশ্রয় লাভ। যখন শ্রীশ্রী বাবাজী মহারাজের বয়স মাত্র ১৫, তখন তাঁর মনে হঠাৎ দীক্ষা নেওয়ার প্রবল ইচ্ছা জাগ্রত হল। এই ইচ্ছাটি নিজে থেকেই তাঁর মনে উদয় হল, কেউ তাঁকে দীক্ষা নেওয়ার জন্য বলে নি। তখন তিনি ম্যাট্রিক পরীক্ষা দেওয়ার জন্য তৈরী হচ্ছিলেন। তাঁর এই ইচ্ছা ক্রমশঃ বলবতী হতে লাগল এবং এই ইচ্ছা প্রকাশ করে তিনি নিজের পিতাকে তাঁর দীক্ষা নেওয়ার ব্যবস্থা করতে বললেন। পিতা প্রথমেও এড়িয়ে গেলেন ও বললেন যে, “এখন তোমার বয়স কম আর দীক্ষা নিতে হলে অনেক নিয়ম মানতে হয়। এখন মন দিয়ে পড়শোনা কর, পরে দেখা যাবে।” কিন্তু শ্রীশ্রী বাবাজী মহারাজের মনে দীক্ষা নেওয়া ইচ্ছা এতাই প্রবল হয়ে গেল যে তিনি পিতাকে বলেন, “আমার যদি দীক্ষা না হয় তাহলে ভাবছি পরীক্ষায় বসব না।”  পিতা তখন পুত্রের দীক্ষার নেওয়ার ব্যাপারে ব্যবস্থা করতে উদ্যত হলেন। তিনি বৃন্দাবনে নিম্বার্ক আশ্রমের তৎকালীন মহন্ত, শ্রীশ্রী প্রেমদাসজী মহারাজকে পত্র লিখে পুত্রের দীক্ষা নেওয়ার আগ্রহ সম্বন্ধে জানালেন। আমাদের শ্রীশ্রী দাদাগুরুজী মহারাজ রাজী হলেন কিন্তু উত্তর দিলেন যে, উনি যখন শিবপুর কলকাতায় আসবেন তখন শ্রীশ্রী বাবাজী মহারাজের দীক্ষা হবে। তিনি আরও লিখলেন যে, “আপনার পুত্রকে তত দিন মন দিয়ে পড়শোনা করতে বলুন।” দীক্ষা অবশ্যই হবে এটা শুনে শ্রীশ্রী বাবাজী মহারাজের মন শান্ত হয়ে গেল এবং তিনি নিশ্চিন্তে পড়া করতে লাগলেন। ইং ১৯৫৫ সালের মার্চ কি এপ্রিল মাসে শ্রীশ্রী বাবাজী মহারাজ শিবপুর হাওড়ার নিম্বার্ক আশ্রমে আমাদের দাদাগুরুজীর নিকট দীক্ষা প্রাপ্ত হলেন। লক্ষণীয় এই যে এত কম বয়সে দীক্ষা নিলেও গুরুদেব তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন না যে, তিনি দীক্ষার নিয়ম পালন করতে পারবেন কি না ইত্যাদি। দীক্ষা সমাপ্ত হলে শ্রীশ্রী প্রেমদাসজী মহারাজ তাঁকে বললেন, “আমি তোমাকে আমার গুরুদেবের চরণে অর্পণ করে দিয়েছি ও তিনিও তোমাকে গ্রহণ করেছেন ও শ্রীশ্রী ঠাকুরজীর চরণে অর্পণ করে দিয়েছেন।” শ্রীশ্রী বাবাজী মহারাজ যখন শুনলেন যে তাঁকে তাঁর প্রিয় “মহারাজজী” গ্রহণ করেছেন, তখন তাঁর মনে একটি অসীম তৃপ্তির অনুভূতি এসেছিল। তাঁর মনে হল যেন বহু জন্মের আকাঙ্ক্ষিত বস্তু তিনি পেয়েছেন। তাঁর বহু গভীর ইচ্ছা সেই দিন পূর্ণ হল, এটাই তাঁর মনে হয়েছিল।

শ্রীশ্রী বাবাজী মহারাজ বাল্য কালে খুব সাহসী ও দুরন্ত প্রকৃতির ছিলেন। তার জন্য তাঁকে অনেক সময় মাতা পিতার শাসনের সম্মুখীন হতে হতই কিন্তু একবার ত তাঁর এই স্বভাব তাঁর জীবনকেই সঙ্কটে ফেলে দিয়েছিল। তখন তাঁর বয়স মাত্র ৯ বছর। একদা ঘুড়ী উড়াতে গিয়ে তাঁর ঘুড়ী একটি আম গাছের উচ্চ ডালে আটকে গেল। তিনি বন্ধুদের বারণ অগ্রাহ্য করে ঘুড়িটি নামাবার জন্য গাছে অনেক উঁচুতে উঠে গেলেন। গাছের ডাল থেকে তিনি ঘুঁড়িটা উদ্ধার করতে সক্ষম হলেন কিন্তু গাছ থেকে নামবার সময় একটি শুকনো ডালে তাঁর পা পড়ল ও সেই ডালটি ভেঙ্গে গেল। তিনি অনেক উঁচু থেকে নিচে পড়লেন এবং একটি পাথরে আঘাত পাওয়ায় তাঁর মাথা ফেটে গেল এবং তা থেকে রক্ত ঝরতে লাগল। প্রাথমিক চিকিৎসার পরে তাঁকে কলকাতা মেডিক্যাল কলেজে নিয়ে য়াওয়া হল যেখানে এক সার্জন আপরেশান করে তাঁর মাথা থেকে পাথরের অনেক ছোট ছোট টুকরোগুলি বার করলেন। সেই সার্জন শ্রীশ্রী বাবাজী মাহারাজের মাকে বললেন, “মাসীমা, আপনার ছেলের বুদ্ধিকেন্দ্রে প্রচন্ড আঘাত লেগেছে। ও ভাল ভাবে পড়াশুনা না করতে পারলে তাকে দোষ দেবেন না।” ডাক্তার হিসাবে সেই সার্জন ঠিকই বলেছিলেন কিন্তু পরবর্তী জীবনে দেখা যায় যে গুরুদেবের কৃপায় তিনি এক অসাধারণ কৃতি ছাত্র ত হলেনই, তাঁর বিষয়গুলিতে তিনি এমন যোগ্যতা অর্জন করলেন যেগুলি এই দেশেই নয়, এই সংসারে অতি বিরল।

মাত্র সতের বছর বয়সে তিনি দ্বারভাঙ্গা মেডিক্যাল কলেজে এম.বি.বি.এস. কোর্সে ভর্তি হলেন। তিনি পড়ায় ত ভাল ছিলেনই, তা ছাড়া তিনি দুই বছর ইউনিভার্সিটির সুইমিং চ্যাম্পিয়ান ছিলেন। কলেজ ফুটবাল টিমের তিনি ক্যাপটেন ছিলেন, এর অতিরিক্ত তিনি অনেক রকমের খেলায় ভাগ নিতেন, কবিতা-কাহিনী লিখতেন, ড্রামা-থিয়েটার করতেন, বাঁশী ও বেহালা বাজাতেন, এবং পেন্টিং ও স্কেচও করতে দক্ষ ছিলেন। নিজের আধ্যাত্মিক কর্তব্যের প্রতিও তাঁর সজাগ দৃষ্টি থাকত এবং তিনি নিয়ম করে গোপীচন্দনের তিলকস্বরূপ করে দুই বেলা জপ করতেন। দীক্ষিত হওয়ায় তিনি কলেজের মেসে অনেক রকমের খাবার খেতে পারতেন না, সেই জন্য কলেজে নয় বছর সময় তিনি বেশীর ভাগ দই-ভাত বা রুটি-আলু ভাজা খেয়ে কাটালেন। নিজের সম্প্রদায়ের খাবারের বিধি নিষেধ তিনি আজীবন মেনে চলেছিলেন।

ইং ১৯৬২ সালে তিনি এম.বি.বি.এস পাশ করলেন এবং ইং ১৯৬৬ সালে তিনি এম.ডি. পাশ করেন। তখনকার কালে এটাই মেডিসিনে সর্বোচ্চ ডিগ্রী ছিল। সেই বছরই তাঁর গুরুদেবের অনুমতি ও আশীর্বাদ নিয়ে তিনি উচ্চ শিক্ষা লাভের জন্য আমেরিকায় চলে গেলেন। এক বছর পরে শ্রীশ্রী বাবাজী মহারাজ ভারতে প্রত্যাবর্তন করেন ও গুরুদেবের অনুমতি নিয়ে সংসার ধর্ম পালনের জন্য বিবাহ করলেন। আমাদের পরমপূজনীয়া শ্রীশ্রীগুরুমার (তখন নাম ছিল কুম. সুদেষ্ণা সরকার) সাথে তিনি বৈদিক রীতি বিধির সহিত পরিণয় সূত্রে আবদ্ধ হলেন। সস্ত্রীক বিদেশ যাওয়ার পূর্বে তিনি গুরুদেবকে প্রণাম করতে শিবপুর নিম্বার্ক আশ্রমে যান ও সেই সময় শ্রীশ্রী দাদাগুরুজী মহারাজ স্বতঃপ্রবৃত্ত হয়ে শ্রীশ্রীগুরুমাকে নাম মন্ত্র দিয়ে দিলেন।

তার পর তিনি প্রায় সাড়ে চার বছর আমেরিকায় উচ্চ শিক্ষার ট্রেনিং নিলেন। কার্ডিওলাজী, নেফ্রোলাজী, ও ইন্টারনাল মেডিসিনে বিশেষজ্ঞতা অর্জন করলেন। আমেরিকার টোলিডো শহরের মৌমি ভ্যালী হাসপাতালের তিনি চিফ রেজিডেন্ট পদ প্রাপ্ত হলেন। সেখানে থাকাকালীন তাঁর হাতে অর্থ বিশেষ থাকত না পরন্তু কোনও দিন তাঁর মনে অভাব বোধ আসে নি। শুধু তাই নয় সেই অল্প বেতনের থেকেও তিনি শ্রীশ্রী ঠাকুরজীর নিত্য সেবার জন্য কিছু অর্থ গুরুদেবকে শিবপুর আশ্রমে অবশ্যই পাঠাতেন।

আমেরিকায় সাড়ে চার বছর বাস করার পর ইং ১৯৭১ সালের জূন মাসে তিনি কানাডায় চলে গেলেন। কানাডার ক্যাম্পব্যালটান শহরে তিনি তাঁর গৃহস্থ  জীবনের পরর্বতী ১৮ বছর কাটিয়েছিলেন এই শহরই তাঁর ডাক্তারী জীবনের কর্মভূমি হয়ে থাকল। প্রধানতঃ তিনি কার্ডিওলাজিস্ট হিসাবেই প্র্যাক্টিস করতেন তবে, চেস্ট, কিডনী, ও ইন্টার্নাল মেডিসিনেও তিনি বিশেষরূপে দক্ষ ছিলেন কারণ, তিনি এই সব বিষয়ে স্পেশালিস্ট হিসেবে অনেক আমেরিকান ডিগ্রী অর্জন করেছিলেন। শ্রীশ্রী বাবাজী মহারাজ যে হাসপাতালে কাজ করতেন তার কার্ডিওলাজি বিভাগকে তিনি এমন ভাবে বিকশিত করলেন যে সেটা একটি বড় শহরের হাসপাতলে তুলনায় উঠে গেছিল। তাঁর অসাধারণ রোগ নির্ণয় করার ক্ষমতার জন্য তাঁকে তার সহকর্মী ডাক্তাররা বলত “A Walking Dictionary of Medicine”, “মেডিসিনের একটি জীবন্ত ও চলন্ত অভিধান।”

শ্রীশ্রী বাবাজী মহারাজের গুরুদেব তাঁকে একদা বলেছিলেন, “ভগবান তোমার কাছে রুগী হয়ে আসেন। তুমি সেই ভাবেই তাঁদের সেবা করবে।” তিনি এই গুরুদেবের এই কথাগুলি কখনো বিস্মৃত হন নি। তাঁর সমস্ত ডাক্তারী জীবনে তিনি কোনও কারণে কখনই কোনো রুগীকে দেখতে মনা করেন নি। যদি কোনও রুগী তাঁর কাছে চিকিৎসার জন্য আসত তা হলে তিনি প্রাণ পণে তার চিকিৎসা করতেন। সময়, খাওয়া-দাওয়া, ঘূম-বিশ্রাম বিসর্জন দিয়ে তিনি রূগীদেরকে নিরাময় করতে চেষ্টা করতেন। ক্যাম্পব্যালটানের ডাক্তাররা জানত যে কোন রূগীর ডায়গনোসিসে অসুবিধা হলে শ্রীশ্রী বাবাজী মহারাজের কাছে জিজ্ঞেস করলে সঠিক নির্ণয় করা যাবে। নিজের পেশার জীবনে তিনি বিপুল অর্থ, খ্যাতি, যশ, প্রতিষ্ঠা, সম্মান ও ভালবাসা পেয়েছিলেন। তাঁর সহকর্মীরা, যাঁরা তার আন্ডারে কাজ করত সেই নার্সরা বা অন্য কর্মীরা, রূগীরা, তাঁকে প্রচুর পরিমানে সম্মান করত এবং বিশেষ করে রূগীরা তাঁর প্রতি খুব কৃতজ্ঞ হয়ে তাঁকে বিভিন্ন প্রকারে ধন্যবাদ দিতেন। কিন্তু এত সব জাগতিক সুখ-ঐশ্বর্যাদি পেয়েও তিনি কোনও দিন মনে করতেন না যে এগুলো তাঁর নিজের কর্তৃত্বের ফল। বরং এগুলো তিনি নিজের গুরুদেবের অশেষ কৃপায় হচ্ছে, এই বুদ্ধি ও জ্ঞানে তিনি দৃঢ় ভাবে প্রতিষ্ঠিত ছিলেন।

কাজের চাপ, এত বিপুল অর্থ, যশ ইত্যাদি পেয়েও শ্রীশ্রী বাবাজী মহারাজ সর্বদা নিজের সাধন ভজন ও ভগবৎ প্রাপ্তির লক্ষ্যের প্রতি উপযুক্ত কর্তব্যে কর্মের জন্য চেষ্টা করতেন। দিনে ১৬-১৭ ঘন্টা কাজে ব্যস্ত থাকলেও জপ-ধ্যান, শাস্ত্রপাঠ, অন্য আধ্যাত্মিক গ্রন্থ পাঠ করতেন। বিদেশে থাকাকালীন তিনি ৭-৮ বার সেওয়া লক্ষ জপের অনুষ্ঠান করেছিলেন। এই জপানুষ্ঠানের সময় তিনি স্বপাক রান্না করতেন, বাইরের খাবার খেতেন না, প্রায় মৌনী থাকতেন, অন্য কারুর বাড়িতে যেতেন না, এই রকম অনেক অনুশাসন মেনে তিনি সেই জপানুষ্ঠান করতেন। বাড়িতে তিনি সম্প্রদায়ের উৎসবগুলি পালন করতেন এবং সেই দিনে শ্রীশ্রী ঠাকুরজীর জন্য বিশেষ ভোগের রান্না করতেন, আরতি ইত্যাদিও করা হত।

বিদেশে থাকার জন্য গুরুদেবের সান্নিধ্য পাওয়া তাঁর জন্য বিরল ছিল। দুই বছরে এক বার করে তিনি সপরিবারে ভারতে আসতেন আর তখন চেষ্টা করতেন যাতে গুরুদেবের সান্নিধ্য বেশী করে পেতে পারেন। শ্রীশ্রী দাদাগুরুজীও প্রিয় শিষ্যের এই কামনা পূর্ণ করার জন্য তাঁকে কুম্ভে ও অন্যান্য তীর্থে নিয়ে যেতেন। সেই তীর্থ ভ্রমণের সময় তিনি নিজের গুরুদেবের অকপট ও অক্লান্ত ভাবে সেবা করতেন। সাধারণ কুলির মতন গুরুদেবের মোট বইতে তাঁর কোনো রকম লজ্জা বা দ্বিধা বোধ হত না। তখন তাঁকে দেখে কারুর মনে আসতে পারত না যে তিনি একজন স্বনাম ধন্য অত্যুচ্চ শিক্ষিত স্পেশালিস্ট ডাক্তার। তাঁর গুরুদেব এই নিষ্কপট ও নিঃস্বার্থ সেবা ভাব দেখে খুব সন্তুষ্ট হয়েছিলেন এবং পুরীতে সমুদ্রের ধারে তাঁকে ভগবৎ সাক্ষাৎকার, ও আত্মজ্ঞান প্রাপ্তির বরদান দিয়েছিলেন। এটা ছিল ইং ১৯৭৯এর ঘটনা।

শ্রী শ্রী দাদাগুরুজী মহারাজকে শ্রীশ্রী বাবাজী মহারাজ নিজের একটি পৃথক আশ্রম করার জন্য অনুরোধ করেছিলেন। শ্রীশ্রী দাদাগুরুজী মহারাজ যখন সে বিষয়ে কৃত সংকল্প হলেন তখন শ্রীশ্রী বাবাজী মহারাজ সেই প্রস্তাবিত আশ্রমের সমস্ত ব্যয় বহন করার ইচ্ছা প্রকাশ করলেন। হলও তাই। লস্করপুর স্থিত “শ্রী সন্তদাস বাবা আশ্রম” যখন তৈরী হয়, তখন তার জমি কেনা থেকে পাঁচীল দেওয়া, আশ্রম নির্মাণ, বিগ্রহ প্রতিষ্ঠা, বিষ্ণু যজ্ঞ ইত্যাদির সমস্ত অর্থ শ্রীশ্রী বাবাজী মহারাজ একাই দিয়েছিলেন। তিনি বিদেশ থেকে টাকা পাঠাতেন ও শ্রীশ্রী দাদাগুরুজী মহারাজ তাঁর নিজের তত্ত্বাবধানে এখানে আশ্রম তৈরী করাতেন। ইং ১৯৭৯ সালে সরস্বতী পূজার দিন এই আশ্রম প্রতিষ্ঠা হয়।

শ্রীশ্রী বাবাজী মহারাজের ইচ্ছা ছিল যে শ্রীশ্রী গরীবদাসজী যেমন গুরুদেবের নিকটে থেকে শ্রীশ্রী কাঠিয়া বাবাজী মহারজের সেবা করতেন সেই ভাবে তিনিও নিজের গুরদেবের সেবা করে শেষ জীবন কাটাবেন। এই উপলক্ষ্যে তিনি নিজের গুরুদেবের নিকট বারম্বার প্রার্থনা জানাতেন তাঁকে স্বদেশে ফিরিয়ে এনে সন্ন্যাস দিতে। শেষে শ্রীশ্রী দাদাগুরুজী মহারাজ রাজীও হলেন কিন্তু বিধির বিধান ছিল অন্য রকম। শ্রীশ্রী বাবাজী মহারাজ ভেবে ছিলেন যে বিদেশের সমস্ত ব্যাপার গুটিয়ে উনি সপরিবারে ইং ১৯৮২ সালে ভারতে চলে আসবেন ও পরিবারের ব্যবস্থা করে গুরুদেবের নিকট সন্ন্যাস গ্রহণ করবেন। কিন্তু ইং ১৯৮১ সালে শ্রীশ্রী দাদাগুরুজী মহারাজ নিজের মর্ত্য দেহ ত্যাগ করে মনুষ্য লীলা সম্বরণ করে গোলোক ধামের জন্য প্রস্থান করলেন। এই সংবাদ শুনে শ্রীশ্রী বাবাজী মহারাজের মনে হল যেন তিনি সমস্ত কিছু হারিয়ে কাঙ্গাল হয়ে গেছেন। তাঁর মনে হল যেন গুরুদেব নিজেই তাঁকে সন্ন্যাস দেওয়ার ইচ্ছা বদলে দিয়েছেন। তিনি ও শ্রীশ্রী গুরুমা প্রথম সুযোগে ভারতে এসে পৌঁছোলেন। শ্রীশ্রী গুরুদেবের তিরোধানের উপলক্ষ্যে তিনি লস্করপুর ও বৃন্দাবনে বৃহৎ ভান্ডারার ব্যবস্থা করলেন। লস্করপুর আশ্রমে ব্যাপারে কিছু সময়োপযুক্ত ব্যবস্থা করে তিনি কানাডায় ফিরে গেলেন।

গুরুদেবের দেহাবসানের পর শ্রীশ্রী বাবাজী মহারাজ প্রায় আট বছর কানাডা়য় ছিলেন। সেই সময়ে তিনি তাঁর পেশায় উচ্চ থেকে উচ্চতর শিখরে উঠতে থাকেন। ইং ১৯৮৯ সালে যখন তিনি মেডিক্যাল প্র্যাক্টিস থেকে অবকাশ গ্রহণ করলেন তখন তাঁর বার্ষিক আয় কয়েক লক্ষ ডলার ছিল এবং তিনি সেই দেশের কোটিপতির মধ্যে ছিলেন। এই সাংসারিক প্রপঞ্চ কিন্তু তাঁকে মোহিত বা আসক্ত করতে পারে নি। যখন তিনি সেখানকার সুখময় জীবন, বিপুল যশ ইত্যাদি ত্যাগ করে স্বদেশ ফিরে আসার সিদ্ধান্ত নিলেন তখন সেই শহরের লোকেরা এই সংবাদ শুনে ক্রন্দন করত। যে রূগীগুলোকে তিনি দেখতেন তাঁরা, তাঁদের পরিবারের আত্মীয় স্বজনরা, তাঁকে এই সিদ্ধান্ত বদলাবার জন্য অনুরোধ ও পীড়াপীড়ি করত। তাঁর সহকর্মী ডাক্তাররাও তাঁর এই সঙ্কল্প শুনে দুঃখিত হল। তাঁর হাসপাতালের প্রবন্ধক তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন যে তিনি ভারতে ফিরে গিয়ে প্র্যাক্টিস করবেন কি না, শ্রীশ্রী বাবাজী মহারাজ বললেন যে তিনি তাঁর শেষ জীবন আধ্যাত্মিক অনুশীলনে কাটাবেন, মেডিসিন প্র্যাক্টিস করবেন না। তখন সেই ভদ্র মহিলা দুঃখিত ভাবে বললেন, “আমি ভারতের জন্য দুঃখিত যে তারা কখনই জানতে পারবে না যে আপনি কি স্তরের ডাক্তার আছেন।”

ইং ১৯৮৯ সালের জুলাই মাসে তিনি সপরিবারে ভারতে ফিরে এলেন। তাঁর পরিবারের সমস্ত ব্যবস্থা করে, তাদের অনুমতি গ্রহণ করে তিনি গৃহস্থ আশ্রম ত্যাগ করে ইং১৯৯০ সালের মার্চ মাসে কলকাতার লস্করপুর আশ্রমে এসে বানপ্রস্থ আশ্রম গ্রহণ করলেন। তার কিছু কাল পরেই সেই বছর বুদ্ধ পূর্ণিমার পবিত্র দিনে বৃন্দাবনের শ্রীসন্তদাস বাবা আশ্রমে তিনি সন্ন্যাস আশ্রম গ্রহণ করেন। তাঁর সাধু গুরুভাইরা এবং কয়েকজন কাকাগুরু সম্মিলিত ভাবে তাঁকে সন্ন্যাস দিলেন এবং তাঁর গুরুদেবের ইচ্ছানুসারে তাঁর নতুন নাম হল – কৃষ্ণদাস

লস্করপুর আশ্রমে তিনি শিষ্য করতে আরম্ভ করেন এবং তাঁর দুই পুত্র তাঁর প্রথম দুই শিষ্য হল। ইং ১৯৯০ সালে ৩রা জূন, গঙ্গাদশহরা, শ্রীশ্রী সন্তদাসজী মহারাজের পবিত্র জন্ম তিথিতে তিনি লস্করপুর আশ্রমের মহন্ত পদ গ্রহণ করলেন। মহন্ত পদ গ্রহণ করলেও তিনি শ্রীশ্রী ঠাকুরজীর কোনও সেবা করতে দ্বিধা করতেন না। মন্দিরে উত্থান করা, শ্রীশ্রী ঠাকুরজীর সেবা পূজা করা, তাঁর ভোগ রান্না করা, ভক্তদের প্রসাদ পরিবেশন করা, গো সেবা করা, গোয়াল ঘর পরিষ্কার করা, মন্দির মার্জনা করা ইত্যাদি সমস্ত কাজ তিনি প্রয়োজনানুসারে প্রফুল্ল মনে করতেন। অনেক সময় তাঁকে স্বহস্তে সব রকমের সেবা করতে হত কিন্তু তাতে তিনি কোনও রকম কুন্ঠা বা আলস্য করতেন না।এই সব কাজের সাথে থাকত ভক্তদের সাথে কথা বলা, আশ্রমের আয়-ব্যয়ের হিসাব রাখা, নাম-দীক্ষা দেওয়া, ভক্তদের পত্রদের উত্তর দেওয়া ইত্যাদি। এই সবের মধ্যে তিনি নিজের জপ, শাস্ত্র পাঠ ইত্যাদি ত করতেনই। তখন তিনি দিনে তিন ঘন্টার বেশী ঘুমোতেন না।

ইং ১৯৯২ সালে এপ্রিল মাসে উজ্জয়িনী কুম্ভ মেলায় তিনি কাঠিয়া বাবা শ্রীশ্রী রামদাস খালসার শ্রীমহন্ত পদে অভিষিক্ত হলেন। কুম্ভ মেলায় সাধু সেবার উপলক্ষ্যে শ্রীশ্রী দাদাগুরুজী মহারাজ এই খালসা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তার পর থেকে দেহাবসান পর্যন্ত শ্রীশ্রী বাবাজী মহারাজ প্রত্যেক কুম্ভে গিয়ে খুব আগ্রহ ও উৎসাহের সহিত সাধুসেবা করতেন। অসংখ্য ভক্তরা কুম্ভ মেলার খালসায় প্রসাদ গ্রহণ করত এবং শ্রীশ্রী বাবাজী মহারাজ তাঁদের থাকার ও খাওয়া-দাওয়ার প্রতি বিশেষ লক্ষ্য রাখতেন। যাতে তাদের কোনো রকম অসুবিধা না হয় সেই বিষয়ে তিনি কোনও রকম ত্রুটি হতে দিতেন না। তাঁর বক্তব্য ছিল যে সাধুসেবা, ভক্তদের সেবা ও শ্রীশ্রী ঠাকুরজীর সেবার মধ্যে কোনও প্রভেদ নাই। তিনটেই সমান ফলপ্রদ।

শ্রী শ্রী বাবাজী মহারাজ সংসারাশ্রমেই কানাডায় থাকাকালীন সর্বসিদ্ধি লাভ করেছিলেন। এই সত্যটা তিনি আমাকে এবং তাঁর কয়েকজন শিষ্য-শিষ্যাদের বলেছিলেন। আমার বা অন্যান্য ভক্তদের প্রশ্নের উত্তর তিনি যে ভাবে আমাদেরকে দিতেন তাতে এটা যথার্থ ভাবে প্রস্ফুটিত হত। সাধারণতঃ তিনি তাঁর সাধন লব্ধ অনুভূতির বিষয়ে বলতে খুবই অনিচ্ছুক ছিলেন কিন্তু, যখন বলতেন তখন তাঁর যে আধ্যত্মিক পথে অন্য কিছু পাবার বা জানার অবশিষ্ট নাই এটা বলতেন। তাঁর সাধনা কালীন সময়ে তিনি উপনিষদ্, শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা, পুরাণ আদি শাস্ত্র ত পড়েছিলেনই, তিনি বিশ্বের সমস্ত প্রধান ধর্মের সম্বন্ধেও বিশেষ জ্ঞান অর্জন করেছিলেন। তাঁর এই সকল অনুভূতি, ভৌতিক বিজ্ঞানের জ্ঞান, ও আধ্যাত্মিক জ্ঞানের পারদর্শিতাকে তিনি জন সাধারণের কল্যাণের জন্য ব্যবহার করেছিলেন যার ফলে আমরা পেলাম তাঁর প্রণীত কিছু অমূল্য গ্রন্থরাশি। নিম্বার্ক সাধন প্রণালী, শান্তির সোপান, সংশয় ভঞ্জন, এই সকল গ্রন্থগুলিতে তিনি তাঁর এই সমষ্টিগত জ্ঞান ও গবেষণার সার প্রকাশ করেছিলেন। এই গ্রন্থ সকল পাঠ করলে নিম্বার্ক সম্প্রদায়ে সাধন পদ্ধতি সম্বন্ধে অন্য কিছু জানা অবশিষ্ট থাকবে বলে মনে হয় না।  তিনি শ্রীশ্রী গুরুদেব ও শ্রীশ্রী ঠাকুরজীর প্রতি তাঁর গভীর ভক্তি প্রকাশ করতেন স্বরচিত গান ও কবিতাগুলির দ্বারা, যার মধ্যে অনেকগুলিকে তিনি নিজের স্বর দিয়েছিলেন। সংসারাশ্রমে থাকাকালীনই তিনি তাঁর গুরুদেবের জীবনী বাংলা ও ইংরেজী ভাষায় লিখেছিলেন। এইগুলি তাঁর সন্ন্যাস গ্রহণের পরে প্রকাশিত হয়েছিল। প্রায় ১৬ বছর সদ্গুরুরূপী লীলার পর ইং ২০০৬ সালে ১৪ই ডিসেম্বরে তিনি মর্ত্যলোক ত্যাগ করে তিনি ব্রহ্মলীন হন।

এই স্থানে তাঁর সম্বন্ধে বিস্তারিত ভাবে লেখা সম্ভব নয়। যে পাঠকরা তাঁর সম্বন্ধে আরও জানতে ইচ্ছুক তারা তাঁর সম্পূর্ণ জীবনী পাঠ করতে পারেন। তার সম্বন্ধে এই সাইটে অন্য স্থানে বিশেষরূপে বলা হয়েছে। এখানে শুধু এইটুকু বলি যে ব্রহ্মজ্ঞ মহাপুরুষের মৃত্যু নাই এই কথার সাক্ষ্য শাস্ত্রেও পাওয়া যায় এবং অন্যান্য সাধকরাও এই বিষয়ে নিজে প্রত্যক্ষ অনুভব করেছেন। যাঁরা এই সম্প্রদায়ে আশ্রিত তারা সকলেই কোন না কোন রূপে নিজের জীবনে এর যথার্থতা অনুভব করেছেন।

আমার পরমপূজ্যপাদ গুরুদেব, কাঠিয়া বাবা শ্রীশ্রী ১০৮ স্বামী কৃষ্ণদাসজী মাহারাজ, এবং আমার পরমপূজ্যপাদ পরদাদাগুরুজী, শ্রীশ্রী ১০৮ স্বামী সন্তদাসজী মহারাজের উপদেশ ও গ্রন্থ সকলকে অবলম্বন করেই এই ওয়েব সাইটে আধ্যাত্মিক তত্ত্ব সকলকে প্রকাশিত করার চেষ্টা হয়েছে। আশা করি এই প্রয়াসকে তাঁরা সহর্ষে অনুমোদন করে, তাঁদের অশেষ কৃপা দ্বারা তাঁদের স্বীকৃতি প্রদান করবেন। শ্রীশ্রী হংস ভগবান থেকে আরম্ভ করে এই সম্প্রদায়ের আমাদের গুরুপরম্পরার সকল পূর্বাচার্যগণের শ্রীচরণে সশ্রদ্ধ প্রণাম জানিয়ে তাঁদেরও কৃপাদৃষ্টির জন্য প্রার্থনা করি।

ওঁ শ্রীগুরবে নমঃ
শ্রীশ্রী মদ্গুরুস্তোত্রম্

সচ্চিদানন্দস্বরৃপায় পরমাত্মস্বরূপিণে ।
সর্বদেবাদিদেবায় শ্রীকৃষ্ণদাসায় তে নমঃ।।১
চন্দনাক্ষিতসর্বাঙ্গায় কাষ্ঠকৌপীন ধারিণে।
কোটিসূর্য্যপ্রভাননে শ্রীকৃষ্ণদাসায় তে নমঃ।।২
শ্রীপ্রেমদাসশিষ্যায় সনকাদিককুলভূষণে।

অদ্বিতীয়ায় মদ্গুরবে শ্রীকৃষ্ণদাসায় তে নমঃ।।৩
আর্তজীবহিতার্থায় নরাবতারধারিণে।
মুক্তিসেতুস্বরূপায় শ্রীকৃষ্ণদাসায় তে নমঃ।।৪
জ্ঞানভক্তিপরিপূর্ণায় অনন্তসুখাভিবর্ষিণে।

সর্বশাস্ত্রপারঙ্গতায় শ্রীকৃষ্ণদাসায় তে নমঃ।।৫
সর্ববিঘ্নবিনাশায় সর্বপাতকনাশিনে ।
নমঃ প্রপন্নপালায় শ্রীকৃষ্ণদাসায় তে নমঃ।।৬
অনন্তানাদিনিত্যায় প্রভবে সর্বব্যাপিনে ।

সর্ববিদ্যাতপোমূলায় শ্রীকৃষ্ণদাসায় তে নমঃ।।৭
নিত্যানন্দনিমগ্নায় সর্বগুণকর্মসাক্ষিণে ।
শান্তায়াত্মরামায় শ্রীকৃষ্ণদাসায় তে নমঃ ।।৮
সর্বেশায় র্সবারাধ্যায় ভগবতে ব্রহ্মরূপিণে।

নমো বৈকুণ্ঠনাথায় শ্রীকৃষ্ণদাসায় তে নমঃ।।৯
কৃষ্ণতত্ত্ব প্রবুদ্ধায় কৃষ্ণভক্তিপ্রদায়িণে ।
নমো বৈ কৃষ্ণরূপায় শ্রীকৃষ্ণদাসায় তে নমঃ।।১০
ইতি কেশবদাসেন কৃতং শ্রীমদ্গুরুস্তোত্রং সমাপ্তম্।

 

ওঁ শ্রীগুরবে নমঃ

ওঁ শ্রী হরিঃ

ওঁ তৎ সৎ

 

CONTINUE READING
Share this post
Come2theweb